তবে বাস্তবে তার চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম এ অর্থনীতি। ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিসের (বিইএ) সর্বশেষ সংশোধিত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ছিল দশমিক ৭ শতাংশ। এর আগে গত মাসে দেয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে এফটির ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি বেড়েছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। সামগ্রিকভাবে ২০২৫ সালে মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের বছরের ২ দশমিক ৩ শতাংশের তুলনায় কম।
বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশ্লেষকদের ধারণার চেয়েও মার্কিন অর্থনীতি বছরের শেষে অনেক বেশি নাজুক অবস্থায় ছিল। মূলত ভোক্তা ব্যয়, রফতানি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মতো তিনটি প্রধান খাতেই প্রত্যাশার চেয়ে কম প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
বিইএর তথ্যমতে, সেবা খাতের রফতানি হ্রাসের কারণে নিট বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এছাড়া সেবা খাতে ভোক্তা ব্যয় আগের তুলনায় অনেক কমেছে। একই সঙ্গে শেষ প্রান্তিকে উৎপাদনমুখী শিল্পে ব্যবসায়িক বিনিয়োগও প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে দুর্বল ছিল।
উল্লেখ্য, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকারের দীর্ঘস্থায়ী শাটডাউনের কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শাটডাউনটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম। এর ফলে অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা নীতিনির্ধারকদের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। ঘটনাটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কারণ তিনি জানুয়ারিতে দাভোস সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ‘বিস্ফোরক’ হারে বাড়ছে।
এদিকে আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভ শুরুতে গত প্রান্তিকের জন্য ৫ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, কিন্তু পরে তারা এ হিসাব কমিয়ে আনে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতিবিদদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন নাগরিকদের ভোক্তা ব্যয়ের ধীরগতি। পূর্ববর্তী তিন মাসে ভোক্তা ব্যয় প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ২ দশমিক ৩ পয়েন্ট ছিল, সেখানে গত প্রান্তিকে তা কমে ১ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
প্যান্থিয়ন ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েল টম্বস বলেন, ধীর কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তা ব্যয়ের গতি এখন অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে।
মার্কিন শ্রমবাজার সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ফলে ভোক্তারা সতর্কতার সঙ্গে ব্যয় করছে।
২০২৫ সালে দেশটিতে মাসে গড়ে কেবল ১০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পে-রোল বা কর্মসংস্থান কমেছে ৯২ হাজার। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট আগামী প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য ভোক্তাদের অন্যান্য খাতের খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য করবে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো চাপের মুখে ফেলবে। তবে আশার কথা হলো, তেল ও গ্যাস রফতানিকারকদের জন্য এ সংঘাত কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে।
এদিকে ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পল অ্যাশওয়ার্থ মনে করেন, সরকারি শাটডাউনের ধাক্কা কাটিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়বে।
আটলান্টা ফেডারেল রিজার্ভের জিডিপি নাউয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্ব অর্থনীতির এ চালিকাশক্তি বর্তমানে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।